ভাঁটফুলের পরিচিতি , ভেষজ গুণ এবং উপকারিতা

অযতনে বেড়ে উঠা ভাঁটফুল গ্রামের মেঠো পথের ধারে ,পতিত জমির কাছে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠে। প্রকৃতির শোভা বর্ধন করে আমাদের চিত্তাকর্ষণ করে । এই ভাঁটফুলে রয়েছে নানা রকম অসাধারণ ঔষধি গুণ যা আমাদের অনেকেরই অজানা।   
ভাঁটফুলের ভেষজ গুণ
হজম শক্তি বাড়াতে, কৃমি প্রতিরোধে, বিরক্তিকর চর্মরোগ সারাতে এমনকি সর্দি-কাশি এবং ম্যালেরিয়া নিরাময়ে এই ফুলের রয়েছে যাদুকরী ক্ষমতা। ভাঁটফুল ,গাছের পাতা ও কাণ্ডের বিভিন্ন অংশ খাওয়া ও ব্যবহারের উপকারিতাগুলো আজ আমরা আলচনা করবো।

পেজ সূচীপত্রঃ ভাঁটফুলের পরিচিতি, ভেষজ গুণ এবং উপকারিতা 

ভাঁটফুল গাছের বর্ণনা ও পরিচিতি

ভাঁট, বনজুঁই বা ঘেঁটু গুল্মজাতীয় বহুবর্ষী সপুষ্পক উদ্ভিদ। বৈজ্ঞানিক নাম Clerondendron viscosum. ভারতবর্ষ, বাংলাদেশ এবং মায়ানমার হলো এর আদি আবাসস্থল। ২ থেকে ৪ মিটার লম্বা ভাঁটগাছের কাণ্ড সোজা দণ্ডায়মান ,যার পাতা ৪ থেকে ৭ ইঞ্চি লম্বা হয়। দেখতে পান পাতার মতো হলেও খসখসে প্রকৃতির। ডালের শীর্ষে পুষ্পদণ্ডে ফুল ফোটে। পাপড়ির রঙ সাদা তবে বেগুনী রঙের আভায় দেখতে চমৎকার।

ভাঁটফুলের শুভ্রতা আর সুগন্ধ মানুষকে বিমোহিত করে। বসন্ত থেকে গ্রীষ্ম পর্যন্ত ফোটা এই ফুলে রয়েছে মিষ্টি সৌরভ। ফুল ফুটলে মৌমাছিরা এই ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে থাকে। গ্রামের মেঠো পথের ধারে ,পতিত জমির কাছে এরা জন্মে কোনোরুপ যত্ন ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠে। এছাড়া পাহাড়ি চূড়ার ঢালে এবং পাহাড়ি পথে এদের চোখে পড়ে। ফুলের রঙ সাদা। সাদা ফুলের মাঝখানে হালকা বেগুনি আভা ফুলটি মানুষের চিত্তাকর্ষক। এতে ৫ টি পাপড়ি ও সম সংখ্যক লম্বা কেশর থাকে।

প্রাকৃতিক মধুর অন্যতম উৎস এই ফুলে মৌমাছি, ভ্রমর বা অন্যসব কীটপতঙ্গ মধু সংগ্রহে এলে ফুলে পরাগায়ন ঘটে। ফুল থেকে বীজ হয়। বীজের রঙ কালো। ফল পাকার সময় পাপড়ি লাল রঙ ধারণ করে। লালের মাঝখানে কালো রঙের টিপ পড়ে গ্রাম্য রাস্তার দুধার শুভ্রতা ছড়ায় যার গন্ধ্যে শালিক ও বুলবুলি পাখি ছুটে আসে। ছুটে আসে মৌমাছি, কীটপতঙ্গ, পোকামাকড়। বীজ এবং কন্দ এই দুয়ের মাধ্যমেই বংশবিস্তার করে। ভাঁটগাছ ঔষধি গুণসম্পন্ন উদ্ভিদ।

ভাঁটফুলের ব্যবহার 

ভাঁটফুল গ্রাম বাংলার অতি পরিচিত এক বুনো উদ্ভিদ। প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠা ভাঁটফুলের শুভ্রতা ও সুগন্ধ মানুষকে আনন্দ দেয় প্রকৃতি প্রেমীদের। নানা ঔষধি গুণসম্পন্ন এই উদ্ভিদ প্রাচীনকাল থেকে আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় মানুষের রোগ সারাতে ব্যবহার হয়ে আসছে।

ঔষধি গুণ থাকায় এই উদ্ভিদের শেকড়, কাণ্ড, পাতা, ফুল ও ফল রোগ নিরাময়ে প্রসিদ্ধ। প্রাকৃতিক মধুর অন্যতম উৎস এই ভাঁটফুল। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা চর্মরোগ নিরাময়ের কার্যকরী ক্ষমতা আছে বিশ্বাসে আরাধনা করে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মন মাতানো গন্ধ

প্রকৃতিকে আরও রঙিন করে দিতে এবং নিজের সৌন্দর্য মেলে ধরতে থোকায় থোকায় পথের ধারে ফুটে থাকে ভাঁটফুল। শীত শেষে ফুটে থাকা এই ফুল ঝরে গেলে দেখা যায় কালো রঙের ফল। ভাঁটফুলের সৌন্দর্য শুধু মানুষকেই আকৃষ্ট করে না। এই ফুলে মধু সংগ্রহ করতে গুণগুণিয়ে ছুটে আসে মৌমাছি। 

ভ্যাঁটফুলের ভেষজ গুণ

ভাঁটবীজ খেতে দলবেঁধে ডানা উড়িয়ে শালিক ও বুলবুলি মানুষের খুব কাছাকাছি এসে যায়। শালিক ও বুলবুলির প্রিয় খাবার এই ভাঁটবীজ। ভাঁটগাছের পাতা জোনাকি পোকার খুব প্রিয়। ভাঁট পাতা খেয়ে জোনাকিরা রাতের আঁধারে মিটমিট করে আলো ছড়ায়।

বাংলা সাহিত্যে ভাঁটফুলের উপস্থিতি

পথের ধারে অযথনে- অবহেলায় বেড়ে উঠা ভাঁটফুল সকলের প্রিয়। সৌন্দর্য প্রিয় মানুষের কাছে এই ফুল যেমন প্রিয় তেমনই প্রিয় কবি সাহিত্যিকের কাছে। বাগান, পরিত্যক্ত মাঠ, বন, রাস্তা কিংবা জলাশয়ের পাশে গজিয়ে উঠা সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটে থাকা এই ফু্লের আকার ,আকৃতি, এবং গন্ধ মানুষকে যেমন আকৃষ্ট করে তেমনি কবি সাহিত্যিকের দৃষ্টি কেড়েছে যুগ যুগ ধরে। 

ভাঁটফুলের সৌন্দর্য এবং গন্ধে বিমোহিত রূপসি বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের কলমে উঠে এসেছে তাই- "বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো কেঁদেছিল তার পায়ে'।

ভাঁটগাছের প্রতিটি অঙ্গেই রয়েছে ঔষধি গুণ

হজমশক্তি বাড়ায়ঃ ভ্যাঁট বীজ ও পাতার রস আমাদের বদহজম এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে পেটের গ্যাসজাতীয় সমস্যা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।
কৃমি প্রতিরোধেঃ আয়ুর্বেদ চিকিৎসা মতে, ভ্যাঁট গাছের পাতা ও বীজের রস খালিপেটে সকালে খেলে কৃমির উপদ্রপ কমে যায়।
চর্মরোগ নিরাময়েঃ ভ্যাঁটফুলের পাতা, ফুল , বীজ ও শেকড় বেটে ত্বকের খোসপাঁচড়া, চুলকানির স্থানে লাগালে সেরে যায় বলে আয়ুরবেদ চিকিৎসা শাস্ত্রে প্রকাশ আছে।
কফ ও শ্বাসকষ্টের যন্ত্রণা কমায়ঃ ভাঁটগাছের পাতায় অ্যাণ্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যাণ্টিইনফ্লোমেটরি উপাদান আছে যা শ্বাসযন্ত্রের রোগ নিরাময়ে সহায়ক। শুকনা ভ্যাঁট পাতা গরম পানিতে ফুটিয়ে কায়ঁ বা চা বানিয়ে খেলে কফ ও শ্বাসকষ্টে উপকার পাওয়া যায়।

ভাঁটফুলের ভেষজ গুণ

জ্বর ও ম্যালেরিয়া নিরাময়ঃ ভ্যাঁট পাতার রস গরম পানির সাথে মিশিয়ে খেলে ম্যালেরিয়া জ্বর উপশম হয়। এছাড়া এর শেকড় জ্বর কমাতে সাহায্য করে।
কীটপতঙ্গের কামড়ে ব্যবহারঃ বিষাক্ত পোকামাকড় কিংবা বিছাপোকায় হুল ফোটালে এর পাতার রস বা ফুলের রস লাগালে জ্বালাপোড়া কমে ও ফোলাভাব কমে যায়।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাঃ আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে, ভ্যাঁট পাতায় থাকে ফ্ল্যাভোনয়েড নামক অ্যান্টিঅক্সিজেন, যা রক্ত শোধন করে আমাদের শরীর থেকে টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়। ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। গাছটির পাতার ফাইবার কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর করে, এবং পাতার এণ্টি-ডায়াবেটিক ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে আনে।

শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য

ভেষজ বা প্রাকৃতিক উপাদান হিসাবে ভ্যাঁট গাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহারের ঐতিহ্যবাহী প্রমাণ রয়েছে। তবে যেহুতু এটি ঔষধি গাছ হিসাবে বহুল পরিচিত সেই কারণে এর ব্যবহারে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়াতে , কোনো জটিল রোগের সমস্যায় সেবনের পূর্বে ভেষজ বা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরী।

গ্রাম বাংলার মেঠো পথ থেকে ঔষধি গুণসম্পন্ন ভাঁটগাছ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে পথের ধারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই গাছ সংরক্ষণে উদ্দ্যোগ গ্রহণ না করলে এমন প্রাকৃতিক গুণ সম্পন্ন ঔষধি গাছ হারিয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে গ্রাম্য পথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

নোশিনবাড়ির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url